জনভাষ্য
/
পরিচিতি

আমাদের সম্পর্কে

০১

ঘোষণাপত্র

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভূত্থান ছাত্রজনতার এক অভূতপর্ব সম্মিলনের ফসল। এই গণঅভূত্থান দীর্ঘদিন ধরে দেশে চলতে থাকা একরৈখিক চিন্তাপদ্ধতি ভেঙে বহুমাত্রিকতায় রূপান্তরিত হয়েছে বা হচ্ছে। সবধরণের মানুষের চিন্তার একটা যৌথতা তৈরি হয়েছে, যার ফলে প্রথমবারের মতো বহুত্বকে ধারণ করে একটি সহমর্মিতার সমাজ নির্মাণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা দেখতে পেয়েছি, এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় বহুদিন ধরে একটি দলের হাতে কুক্ষিগত হয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসের বহুমাত্রিক বয়ান সামনে এসেছে, কোন একক নেতা নয় বরং লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণেই যে এই দেশটি স্বাধীন হয়েছে - সেইসব প্রান্তিক মানুষদের কথা এখন বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। নিরপেক্ষ ইতিহাসের বয়ান যেমন উঠে আসছে, একই সাথে ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিলুপ্তির জনআকাঙ্ক্ষা তৈরী হয়েছে। আমরা আরো দেখতে পাচ্ছি, বহুত্ববাদী-সমাজের সময়ানুগ ভাষ্য তৈরী হচ্ছে, ধর্ম ও নানান বিশ্বাসজনিত বৈষম্য ভেঙে পড়ছে। পাহাড় থেকে সমতল, নদী থেকে হাওর সবখানেই এখন মানুষকে তার অধিকারের প্রশ্নে সবল আলাপ করতে দেখা যাচ্ছে। এমন বহু আশাজাগানিয়া তৎপরতা লক্ষণীয়। তবে এসব কিছুর অভীষ্ট লক্ষ্য একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। যদিও আমরা সবাই জানি এই লক্ষ্য পূরণ রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে বহুদিন পর যেহেতু সমাজের সকল শ্রেণি, পেশা, বর্ণ, গোত্র, ধর্ম ও রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষের মধ্যে একটা ঐক্য সৃষ্টি হয়েছে ফলে আমরা পরিবর্তন নিয়ে আশাবাদী। ‘বৈপ্লবিক প্রযুক্তি’ও ‘প্রযুক্তিক বিপ্লব’এর এক অভাবনীয় সময়কে যে তরুণ প্রজন্ম নিয়ন্ত্রণ করছে তাদের বাংলাদেশ ২.০ বিনির্মাণের চেষ্টায় আমরাও অংশীজন।
০২

আমাদের ভাবনা

আমরা মনে করি, বৈষম্যমুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ তৈরি করতে হলে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ, আইন প্রণয়ন এবং শাসনতন্ত্রে সকল স্তরের জনগণের সামষ্টিক অভিপ্রায়কে প্রতিফলন ঘটাতে হবে। আইন প্রণয়নে সর্ব স্তরের মানুষের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ যুক্ত থাকতে হবে। এটিই ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও বিপ্লবের জনপ্রত্যাশা। তবে মনে রাখতে হবে “জনগণ” বহুবিধ জনগোষ্ঠির সমষ্টি, আবার বিভিন্ন বর্গের মধ্যে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও শ্রেণিগত পার্থক্য ও বৈচিত্র্যতা রয়েছে। ফলে শুধু মুখে বহুত্বের কথা বলাই যথেষ্ট নয়। জনগণের অভিপ্রায়ের প্রতিফলন ঘটানো একটি অত্যন্ত জটিল ও কঠিন প্রক্রিয়া। ইতিহাসে বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামে প্রতিনিধিত্বশীল জনগোষ্ঠির অংশগ্রহণ ব্যাপক মাত্রায় থাকে। পরে দেখা যায়, কেবল তাদের মতামতই শাসন পদ্ধতি ও সংস্কার রূপরেখায় প্রতিফলিত হচ্ছে। এবারের গণঅভ্যুত্থানের মনোবল যেন কোনভাবে নষ্ট না হতে পারে এজন্য সবার অংশগ্রহণ বা সকল মত, পথ ও গোষ্ঠির অন্তর্ভুক্তি হচ্ছে কিনা তা সতর্কভাবে খেয়াল রাখা এবং সোচ্চার হওয়া সমাজের সচেতন অংশের কর্তব্যের পর্যায়ে পড়ে। মনে রাখতে হবে, দীর্ঘকাল যাবত দেশে কার্যকর গণতন্ত্র অনুপস্থিত থাকায় এবং দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচলিত চর্চায় জনগণের সাথে সরাসরি রাষ্ট্রীয় নীতি বিষয়ে গণসংযোগ ঐতিহাসিকভাবে কম থাকায় সাধারণ নগারিকের নীতি-পরমার্শ কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছানো একপ্রকার অপ্রচলিত, অদেখা বিষয়।
০৩

জনভাষ্যের উদ্দেশ্য

গণঅভূত্থানের সক্রিয় অংশীজন হিসাবে আমরা “জনভাষ্য” নামে একটি নাগরিক সংগঠন তৈরি করেছি। এই সংগঠনের উদ্দেশ্যগুলো হলো- ১) সংস্কার প্রশ্নে ব্যাপক মাত্রায় নাগরিক সংযোগ স্থাপন করা যেনো ক্রমশ এই চর্চার মাধ্যমে নীতি সংস্কারে মূল্যবান মতামত অথবা চিন্তা তৈরি করতে সক্ষম এমন নাগরিকগণ অধিক পরিমাণে অংশ নিতে পারেন। ২) জনগণের মৌলিক ও নাগরিক অধিকার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নীতিতে সাধারণ নাগরিকের পরামর্শ, প্রয়োজন, প্রত্যাশাসমূহ জানা এবং তা নীতিনির্ধারণ ও সংস্কার প্রকল্পে মূল্যবান মতামত হিসাবে হাজির করা। সোজা কথায়, জনভাষ্যের আয়োজনে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের মাধ্যমে নাগরিকদের কাছ থেকে তাদের আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে আনা, তাদের কথা শোনা- যেন সেই অনুযায়ি বিশেষজ্ঞরা জনগুরুত্বপূর্ণ সেক্টরের জন্য নীতি-প্রস্তাবনা তৈরি করা এবং সেই মতামত সরকারের অংশীজনদের কাছে পৌঁছানো যায় তা নিশ্চিত করা। এই আয়োজন কোনভাবেই নাগরিকগণের সচেতনতা বৃদ্ধি অথবা কোনো সংস্কার ভাবনা নাগরিকদের মধ্যে প্রচার করার জন্য নয়, বরঞ্চ উল্টোভাবে নাগরিকদের কাছ থেকে নীতি-ভাবনা সংগ্রহ করে আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক নীতি-নির্মাণে সচেষ্ট হওয়া। এতে বিদ্যমান ও অপরাপর নীতি-প্রস্তাবের সাথে বিচার-বিশ্লেষণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের শর্তপূরণে নাগরিক মতামতসমূহকে সর্বজনের সিদ্ধান্তের জন্য উপস্থিত করা যাবে। একইসাথে পরস্পরবিরোধী মত-পথের মানুষ সর্বজন সভায় উপস্থিত হওয়ায় এবং মতামত উপস্থাপনের মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে একটি নতুন সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরির পথ সহজ করবে। সেইসাথে সমাজের সংখ্যায় কম, শক্তিতে দুর্বল, অধিকার ও সুবিধা ভোগে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠির সমাধিকারের ও সুযোগের পথও তৈরি হবে।